অধীনস্তদের সাথে আচরণ- ইসলামের শিক্ষা কতই না চমৎকার

হযরত উসমান (রাঃ) একদিন উনার এক গোলামের উপর রাগ করে তার কান ধরে সজোরে টান দিলেন। গোলাম ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। উসমান (রাঃ) চিন্তায় পড়ে গেলেন, আহা! কী করেছি। আল্লাহর ভয়ে ভীত হলেন।

গোলামকে ডেকে বললেন- আমি তোমাকে কানমলা দিয়েছি। তুমি আমার থেকে প্রতিশোধ নাও। গোলাম আর কী প্রতিশোধ নেবে, সে লজ্জায় জড়-সড় হয়ে গেল। উসমান (রাঃ)- এর পিড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে আদবের সঙ্গে কান ধরল। তিনি উচ্চস্বরে বললেন- জোরে টান দাও! দুনিয়ার প্রতিশোধ আখেরাতের প্রতিশোধের চেয়ে উত্তম। [১]

অধীনস্তদের সাথে আচরণ।

উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) এর খিলাফতকালে মুসলিমরা জেরুজালেম অবরোধ করেন। অবরোধের একপর্যায়ে নগরাধ্যক্ষ্য বিশপ সফ্রোনিয়াস আত্মসমর্পণ এবং জিজিয়া পরিশোধে সম্মত হন। তবে শর্ত দেন যে, তিনি খলিফা হযরত উমার (রাঃ) এর কাছে আত্মসমর্পণ এবং নগরীর চাবি হস্তান্তর করবেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে উমার (রাঃ) ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে একজন ভৃত্যকে সঙ্গে নিয়ে একটি সাদা উটে চড়ে জেরুজালেম রওনা হন। পথিমধ্যে উট থেকে নেমে ভৃত্যকে নেমে উটের উপর চড়ান এবং নিজে উটের রশি ধরে সম্মুখে হেঁটে চলেন। এভাবে একবার নিজে এবং একবার ভৃত্যকে উটে চড়িয়ে জেরুজালেমে পৌঁছান। [২]

 

কবি কাজী নজরুল ইসলাম উনার ‘উমর ফারুক’ কবিতায় এটিকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন,

“ভৃত্য দস্ত চুমি

কাঁদিয়া কহিল, ‘উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি?

উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি

আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?’

খলিফা হাসিয়া বলে,

‘তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে।

রোজ-কিয়ামতে আল্লাহ যে দিন কহিবে, ‘উমর! ওরে

করেনি খলিফা, মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে।’

কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসূলে ভাই।

আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু, মোর অধিকার নাই।

আরাম সুখের, -মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা।

ইসলাম বলে, সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কেবা।”

 

অধীনস্তদের সাথে আচরণ।

উনারা এইধরণের আচরণ শিখেছিলেন কোথা থেকে?

উনারা শিখেছিলেন রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে অর্থাৎ ইসলাম থেকে। ইসলামের শিক্ষা কতই না চমৎকার। আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, “আমি দশ বছর নবী করিম (সাঃ) এর সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। এ সময়ের মধ্যে তিনি কখনও আমাকে অপমান করেননি, আঘাত করেননি এমনকি আমার দিকে কখনও ভ্রুকুটি করেননি। তাঁর দেয়া আদেশ পালন না করার জন্য কখনও আমাকে দোষারোপ করেননি। এমনকি ঘরের কেউ যদি আমাকে দোষারোপ করতেন, তাহলে তিনি বলতেন, ‘তাকে তার মতোই থাকতে দাও। কারণ যেটা পূর্ব নির্ধারিত সেটা ঘটবেই।’ [৩]

আরেকটি বর্ণনায় আছে, “তিনি কখনও উহ্ (রাগ প্রকাশের অভিব্যক্তি) প্রকাশ করেন নি এবং আমি যা করতাম সেটার কারণ তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করতেন না অথবা যে কাজটা আমি অসম্পূর্ণ রাখতাম সে ব্যাপারে নবী করীম (সাঃ) কোনো কৈফিয়ত চাইতেন না। ”[৪]

মাঝেমধ্যেই পত্রিকায় কাজের ছেলে-মেয়ে অথবা অধীনস্তদের উপর অত্যাচার নির্যাতনের খবর বেরোয়। বাইরে কোন ব্যপারে টু শব্দ করতে না পারলেও অনেকেই অধীনস্তদের উপর অত্যাচারে সিদ্ধহস্ত। অথচ ইসলাম আমাদের কত সুন্দর আচরণ শেখায়! নিজের আপন মেয়েদের জীবন্ত কবর দেয়া মানুষগুলোই পরবর্তীতে অধীনস্তদের উপর কি সুন্দর আচরণ করেন, শুধুমাত্র ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কারণে।

অধীনস্তদের ব্যপারে আমরা সতর্ক হই। কারণ এর জন্যও আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। আমাদের আচরণ এমন হওয়া উচিত যাতে কেউ আমাদের সংস্পর্শে আসার পর আর যেতে না চায়। যেমনটি ঘটেছিল রাসূল (সাঃ) এর দাস যায়িদ ইবনে হারিসা (রাঃ) এর ক্ষেত্রে। ঘটনাক্রমে উনি দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে গিয়েছিলেন এবং একসময় রাসূল (সাঃ) এর হাতে আসেন। একসময় উনার পিতারা খবর পেয়ে আনতে আসলে রাসূল (সাঃ) উনাকে মুক্ত করে দেন। কিন্তু উনি রাসূল (সাঃ) কে ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন। আল্লাহ আমাদের আচরণও এরকম সুন্দর করার তৌফিক দিন।

___________________________

তথ্যসূত্রঃ

[১] দুনিয়া-বিমুখ শত মনীষী, মুহাম্মাদ সিদ্দীক আল-মিনশাভী

[২] ক্রুসেড, সাহাদত হোসেন খান

[৩] লিডারশীপ, সুলাইমান বিন আওয়াদ ক্বিয়ান

[৪] তিরমিজী

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*