ইক্বরাঃ জ্ঞানভিত্তিক এক উম্মাহ

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওপর অবতীর্ণ কুরআনের প্রথম শব্দটি ছিল “ইক্বরা”। -এর তাৎপর্য হলো, আমরা মুসলিমরা সেই উম্মাহ যে উম্মাহ অধ্যয়ন করে, গবেষণা করে এবং সর্বোপরি দ্বীনের ইলম বা জ্ঞানার্জন করে। এই একটি শব্দ একটি নিরক্ষর জাতির মাঝে আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল, তাদের মধ্যে তৈরি করেছিল বিশ্ববরেণ্য আলেমসমাজ। সে সময় নবীজি (সঃ) এর অনুসারীরা ছিল নিরক্ষর, কিন্তু এই শব্দগুলো তাদেরকে লিখতে ও পড়তে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম উম্মাহ বিশ্বের উচ্চ শিক্ষিত ও জ্ঞানী জাতিতে পরিণত হয়েছে। এই উম্মাহর মাঝে যে পরিমাণ আলেম তৈরি হয়েছে, তা অতুলনীয়। মুসলিম উম্মাহর আলেমদের গুণাগুণ লক্ষ করলে দেখা যাবে, তারা অনন্য- তাদের সাথে অন্য কোনো জাতির বিদ্বানদের তুলনাই হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, ইমাম বুখারি (র)- আড়াই লক্ষেরও বেশি হাদীস তাঁর ছিল মুখস্থ। কিংবা ইমাম শাফেঈ (র)- যিনি বলেছিলেন, ‘আমি যখন কোনো বই খুলি তখন আমি তার একটা পাতা ঢেকে রাখি, কারণ আমি একটা পাতার সাথে আরেকটা পাতার তথ্য মিলিয়ে ফেলতে চাই না।’ তাদের ছিল অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, ফটোগ্রাফিক মেমোরি, ছবির মতো করে সব তথ্য মনে রাখতে পারার ক্ষমতা। অথবা শাইখ আল ওয়াফা বিন আকীল, যিনি তিনশ গ্রন্থের একটি বিশ্বকোষ লেখেন। অবশ্য দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা এখন আর নেই। ওটার মূল পান্ডুলিপি বাগদাদ লাইব্রেরি থেকে লুট করে নেওয়া হয়। এটাই ছিল “ইক্বরা” শব্দের শক্তি, যা পুরো উম্মাহর এতটা পরিবর্তন এনে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল একটু ভিন্ন। তিনি লিখতে বা পড়তে জানতেন না। তাঁর কাছে এই শব্দটির মানে ছিল ‘তিলাওয়াত করুন’, অর্থাৎ তিলাওয়াত করুন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার বাণীর পুনারাবৃত্তি করুন।

আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁর রাসূল (সঃ) কে নিরক্ষরই রাখতে চেয়েছেন, এটি ছিল আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নবীজি (সঃ) এর জন্য হুকুম। সূরা আল আনকাবূতে আছে,

“এবং আপনি তো এর পূর্বে কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং স্বহস্তে কোনো কিতাব লিখেননি। এরূপ হলে মিথ্যাবাদীরা অবশ্যই আপনার উপর সন্দেহ আরোপ করতো। (সূরা আনকাবূত ২৯ঃ৪৮)

আল্লাহ তাআলাই বলছেন যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)  কুরআনের আগে কোনো কিতাব পাঠ করেননি, তাঁর মাঝে লেখার বা পড়ার যোগ্যতা ছিল না। তিনি ছিলেন নিরক্ষর। সাধারণ মুসলিমদের জন্য পড়তে জানাই হচ্ছে জ্ঞানার্জনের চাবিকাঠি। কিন্তু নবীজি (সঃ) এর জন্য সত্যি বলতে, লিখতে-পড়তে পারটা জরুরি ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং জিবরীল (আঃ) থেকে শিক্ষা নিচ্ছিলেন। সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে যে জন জ্ঞানার্জন করছেন, তাঁর জন্য ইক্বরা শব্দটির অর্থ হলো “তিলাওয়াত করুন”, কিন্তু উম্মাহর জন্য এর অর্থ হলো, “পড়ুন”। মুসলিমদেরকে লিখতে ও পড়তে শিখতে হবে।

“নুন। কসম কলমের এবং তারা যা লিপিবদ্ধ করে তার।” (সূরা কালাম, ৬৮ঃ০১)

যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কোনো কিছু নিয়ে শপথ করেন, তার অর্থ হলো সেই বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ কলমের নামে শপথ করেছেন। বদরের যুদ্ধে যুদ্ধবন্দী মুশরিকদের এই মর্মে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, তার দশজন মুসলিমকে লিখতে ও পড়তে শেখাবে। এসব থেকে বোঝা যায় ইসলাম জ্ঞানার্জনের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছে।

এই উম্মাহ জ্ঞান ও পান্ডিত্বে পারদর্শী এক উম্মাহ, যদিও দুর্ভাগ্যবশত আজ এই উম্মাহ তার দায়িত্ব পালনে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। ইলম অর্জনের ব্যাপারে উম্মাহর বর্তমান প্রজন্মের এই অনীহা যেন পরবর্তী প্রজন্মেও প্রসারিত না হয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

একবার বাচ্চাদের মধ্যে একটা জরিপ চালানো হয়। বিষয়বস্তু ছিল- কারা পড়তে ভালবাসে এবং কারা পড়তে ভালবাসে না। জরিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাচ্চাদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ে তারতম্যের কারণে কিছু বাচ্চা পড়তে ভালবাসছে, আর অন্যেরা পড়তে অপছন্দ করছে সেগুলো খুঁজে বের করা। ফলাফলে দেখা গেল যেসব শিশুরা পড়তে পছন্দ করে, তাদের মাঝে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান-

এক, তাদের বাবা-মা’রাও পড়তে ভালোবাসে। শিশুর বিকাশের প্রথম বছরগুলোই তার অনুকরণ করার সময়। একটা শিশু যখন তার বাবা-মাকে পড়তে দেখে, তখন তারা পড়তে না জানলেও আপনা-আপনি বই বা ম্যাগাজিন নিয়ে খেলতে শুরু করে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তাই বাড়িতে শিশুদের সামনে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা হলে তাদের জন্য বই পড়ার দৃষ্টান্ত তৈরি করা সম্ভব।

দুই, যদি তার বই পুস্তক সমৃদ্ধ কোনো জায়গায় বেড়ে ওঠে, অর্থাৎ যেখানে প্রচুর বই কিংবা লাইব্রেরি আছে। অর্থাৎ তাদের জন্য বই খুব সহজলভ্য, এসব ক্ষেত্রে বড় হলে তারাও পড়তে ভালবাসে।

তিন, নিজস্ব লাইব্রেরি থাকলে।

চার, তাদের বাবা-মা যদি তাদেরকে প্রায়ই বইয়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে থাকেন।

পাঁচ, তারা এমন ধরণের শিশু যারা টেলিভিশন খুব কম দেখে কিংবা একেবারেই দেখে না।

বাবা-মায়েদের জন্য তথ্যগুলো অতীব জরুরি। লক্ষ্যণীয় হচ্ছে, বাচ্চাদের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে, আজেবাজে গল্পের বই পড়বে বা যা-খুশি তা-ই পড়বে। কিছু বই আছে যেগুলো মানসিক বিকাশের সময়ে পড়া হলে ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়াবে। যেমন মদীনার প্রাথমিক যুগে এমন একটি ঘটনা আছে, রাসূল (সঃ) দেখলেন উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) তাওরাতের পাতা উল্টাচ্ছেন। রাসূল (সঃ) রেগে গেলেন, উমরকে এই কাজের জন্য কঠিনভাবে তিরস্কার করলেন। তবে তাওরাত পড়ার ওপর এই নিষেধাজ্ঞা ছিল সাময়িক। মুসলিমরা পরবর্তীতে নিজেদের আদর্শে বলীয়ান হলে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। রাসূল (সঃ) বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে ইতিপূর্বে বনী ইসরাইলের কিতাব পড়তে নিষেধ করেছিলাম, তবে এখন সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছি। তোমরা এসব গল্পে বিশ্বাসও করবে না, অবিশ্বাসও করবে না।’ অন্য কথায়, এইসব কিতাবে এমন কিছু কথা আছে, যেগুলোর সত্যতা কুরআন বা হাদীস দিয়ে যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই, সেগুলোকে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনোটাই করা ঠিক হবে না।

যেকোনো পাঠ্যসূচি এমনভাবে সাজানো উচিত যেন তা ছাত্রদের জন্য বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। রাসূল (সঃ) জানতেন, প্রাথমিক যুগে মুসলিমদের হাতে তাওরাত চলে গেলে তা তাদের স্বাভাবিক শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি করবে। ইবন মাসউদ (রাঃ) বলেন, ‘তুমি যদি মানুষের সাথে এমন কথা বলো যা তাদের বোধশক্তির বাইরে, তাহলে সেটা তাদের জন্য ফিতনা হতে পারে।’ কিছু জ্ঞান হচ্ছে কাজের আর কিছু অনর্থক।

এজন্য রাসূল (সঃ) প্রায়ই আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞানের জন্য প্রার্থনা করছি, এবং আমি সেই জ্ঞান থেকে পানাহ চাই যে জ্ঞান কোনো কাজে আসে না।’

-The life of Prophet Muhammad PBUH. by Imam Anwar Al Awlaki

অনুবাদ নেওয়া হয়েছে, রেইন ড্রপস মিডিয়া প্রকাশিত ‘সীরাহ’ বই থেকে।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*