আমরা সীরাহ পড়ি, কিন্তু সেখান থেকে কি শিক্ষা গ্রহণ করি?

আবিদ আর মাসুম। দুই বন্ধু। তাদের দ্বীনি ভাই বললেই বেশি মানায়। তারা একত্রিত হলে সাধারণ আলাপের চেয়ে ধর্মীয় আলাপই বেশি হয়। ইসলামের বিভিন্ন টপিকস নিয়ে আলোচনা। গতানুগতিক যে ইসলাম পালন করা হয় সেটা দুজনেরই অপছন্দ। অর্থাৎ নামাজ, রোজা কর আর নিজের মত জীবন কাটিয়ে দাও। অথচ ইসলাম মানে তো কেবল নামাজ-রোজা না!

সেজন্য তারা রাসূল (সা) এবং উনার সাহাবী (রা) দের কিভাবে সর্বোচ্চ অনুকরণ করা যায় এসব বিষয়ে আলোচনা করছিল।
আবিদ বলছিল, ‘বর্তমান সমাজের যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, অশান্তি কখনোই দূর হবে না যদি সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা না করা যায়। কারণ যেই স্রষ্টা এই সমাজ, এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন তিনিই সবচেয়ে ভাল জানেন কিসে এর কল্যাণ রয়েছে। তাই উনার দেওয়া সেসব বিধান ছাড়া সমাজে শান্তি সম্ভব নয়।’
-মাসুম মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, এটাতো আমরা সবাই বুঝি। কিন্তু প্রশ্ন হল, কিভাবে সমাজে আল্লাহর বিধান তথা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা যাবে??’


-আবিদ বলল, ‘এর জন্য আমাদের কাজ করতে হবে, একতাবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ইসলাম একাকী পালনের বিষয় নয়। রাসূল (সা) এবং সাহাবীগণ একা একা ইসলাম পালন করেন নি। সম্মিলিতভাবে কীভাবে কাজ করা যায় এবং এর গুরুত্ব কত বেশি এ বিষয়ে ছোট একটা ঘটনা বলি-
রাসূল (সা) এর ইসলাম প্রচার শুরুর পর যখন মুশরিকরা আবিষ্কার করলো ঈমানদারদের মধ্যে কিছু লোক আবিসিনিয়া হিজরত করে সেখানে নিরাপদে আছে আর মক্কায় হামযা (রা), উমর (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা বুঝতে পারল যে ইসলাম দ্রুততার সাথে প্রসার লাভ করতে শুরু করেছে।

তখন মুশরিকরা একত্রিত হয়ে বনী হাশেম ও বনী মোত্তালেব গোত্রকে সর্বাত্নক বয়কট করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা অংগীকারাবদ্ধ হয় যে এদের সাথে কেউ বৈবাহিক সম্পর্ক করবে না, বেচাকনা করবে না, তাদের সাথে ওঠাবসা করবে না, মেলামেশা রাখবে না, তাদের ঘরে যাবে না, তাদের সাথে কথাবার্তা বলবে না, যতোক্ষণ না বনী হাশেম ও বনী মোত্তালেব রাসূল (সা) কে হত্যার উদ্দেশ্যে তাদের হাতে সমর্পণ করবে।

এ বয়কটের ফলে পরিস্থিতি একসময় এত গুরুতর হয়ে ওঠে যে অবরুদ্ধদের গাছের পাতা এবং চামড়া খেয়ে তাদের জীবন ধারণ করতে হয়। ক্ষুধার কষ্ট এতো মারাত্মক ছিলো যে, নারী ও শিশুদের কাতর কান্নার আওয়ায শেবে আবু তালিবের বাইরে থেকে শোনা যেত।

এ অবস্থায় পুরো তিন বছর কেটে যায়। এরপর কুরাইশদের মধ্যেকার কিছু লোক এ ব্যবস্থার বিরোধী থাকায় তারাই এ বয়কট অংগীকারের দলিল বাতিল করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এ অমানবিক বয়কটের অংগীকার সম্বলিত দলিল বিনষ্ট করার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন বনু আমের ইবনে লুয়াই গোত্রের হেশাম ইবনে আমর নামক এক ব্যক্তি। হেশাম রাত্রিকালে চুপিসারে খাদ্যদ্রব্য পাঠিয়ে আবু তালেব ঘাঁটিতে অবরুদ্ধ বনী হাশেমের লোকদের সাহায্য করতেন। হেশাম প্রথমে যোহায়র ইবনে আবু উমাইয়া মাখযুমীর কাছে যান। যোহায়রের মা আতেকা ছিলেন আবদুল মোত্তালেবের কন্যা, আবু তালেবের বোন। হেশাম তাকে বললেন, যোহায়র, তুমি কি চাও, তোমরা মজা করে পানাহার করবে, অথচ তোমার মামা এবং অন্যরা ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে? তারা কি অবস্থায় রয়েছে, সেটা তুমি কি জানো না? যোহায়র বললেন, আফসোস, আমি একা কি করতে পারি? যদি আমার সাথে আরো কেউ এগিয়ে আসতো তবে আমি বয়কট দলিল বিনষ্ট করার উদ্যোগ গ্রহণ করতাম। হেশাম বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার সাথে অন্য একজন রয়েছে। যোহায়র জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কে? হেশাম বললেন, আমি। যোহায়র বললেন, আচ্ছা, তবে তৃতীয় কাউকে খুঁজে বের করো।

একথা শোনার পর হেশাম মোতয়েম ইবনে আদীর কাছে যান এবং আবদে মানাফের বংশধর বনু হাশেম ও বনু মোত্তালেবের সাথে তার নিকটবর্তী বংশীয় সম্পর্কের কথা উল্লেখপূর্বক তাকে তিরস্কার করে বললেন, ‘তুমি বনী হাশেম ও বনী মোত্তালেবের বিরুদ্ধে গিয়ে কি করে কোরায়শের সহযোগিতা করলে?’ উল্লেখ্য, মোতয়েম বিন আদীও আবদে মানাফের অধস্তন বংশধরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তিনি বললেন, আফসোস, আমি একা কি করতে পারি? হেশাম বললেন, আরো একজন আছেন। মোতয়েম জিজ্ঞেস করলো, তিনি কে? হেশাম বললেন আমি। তখন মোতয়েম বললেন, আচ্ছা, তৃতীয় একজন লোক খুঁজে নাও। হেশাম বললেন, সেটাও করেছি। মোতয়েম বললেন, তিনি কে? হেশাম বললেন, তিনি হচ্ছেন যোহায়র ইবনে আবী উমাইয়া। মোতয়েম বললেন, আচ্ছা, তাহলে চতুর্থ একজন তালাশ করো।

এরপর হেশাম আবুল বাখতারীর কাছে যান এবং তাকেও মোতয়েমের মতো বলেন। আবুল বাখতারী জানতে চাইলেন, এ ব্যাপারে তার সমর্থক কেউ আছে কিনা। হেশাম বললেন, হাঁ আছে। এরপর তিনি যোহয়র ইবনে আবু উমাইয়া, মোতয়েম ইবনে আদী এবং নিজের কথা জানালেন। আবুল বাখতারী বললেন, আচ্ছা, তবে বিশ্বস্ত আরেকজন লোক খোঁজ কর।

এরপর হেশাম যাময়া ইবনে আসওয়াদ ইবনে মোত্তালেব ইবনে আছাদের কাছে যান। তাকে বনু হাশেম ও বনু মোত্তালেবের সাথে তার আত্মীয়তার কথা স্মরণ করান। তিনি জানতে চাইলেন, অন্য কেউ সহায়তাকারী আছে কিনা। হেশাম বললেন, হাঁ, আছে। এরপর তিনি সকলের নাম জানালেন। পরে উল্লিখিত সবাই হাজুন নামক জায়গায় একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে বয়কট দলিল বিনষ্ট করার ব্যপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হন। যোহায়র বললেন, প্রথমে আমি কথা তুলবো।

সকাল বেলা নিয়মানুযায়ী সবাই নিজ নিজ মজলিশে একত্রিত হন। যোহায়র দামী পোশাক পরিধান করে সেজেগুজে আসেন। তিনি প্রথমে সাত বার কাবা ঘর তাওয়াফ করে সবাইকে সম্বোধন করে বললেন, মক্কাবাসীরা শোনো, আমরা পানাহার করবো, পোশাক পরিধান করবো, আর বনু হাশেম ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের কাছে কিছু বিক্রি করা হচ্ছে না, তাদের থেকে কেনাও হচ্ছে না। খোদার কসম, এ ধরনের আত্মীয়তা ছিন্নকারী অমানবিক দলিল বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আমি নীরব হয়ে থাকতে পারি না। আমি চাই এ দলিল বিনষ্ট করে ফেলা হোক।

আবু জাহল এ কথা শুনে বললো, তুমি ভুল বলছো। খোদার কসম, এ দলিল ছিন্ন করা যেতে পারে না।
যাময়া ইবনে আসওয়াদ তখন বললেন, খোদার কসম তুমিই ভুল বলছো। এ দলিল যখন লেখা হয়েছিলো, তখনো আমরা এতে রাজি ছিলাম না। আমরা এটা মানতে প্রস্তুত নই। এরপর মোতয়েম ইবনে আদী বললেন, তোমরা দু’জনে ঠিকই বলছো। এ দলিলে যা কিছু লেখা রয়েছে, তা থেকে আমরা আল্লাহর কাছে দায়মুক্ততার ঘোষণা করছি। হেশাম ইবনে আমরও একই ধরনের কথা বললেন।
এ অবস্থা দেখে আবু জাহল বললো, হুঁ বুঝেছি, রাত্রিকালেই এ ধরনের ঐক্যমত্য হয়েছে। এ পরামর্শ এখানে নয়; বরং অন্য কোথাও করা হয়েছে।

সে সময় আবু তালেবও হারাম শরীফের এক কোণে উপস্থিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জানিয়েছিলেন, দলিল বিনষ্ট করতে আল্লাহ তায়ালা এক রকম পোকা পাঠিয়েছেন।
আবু তালেব কোরায়শদের বলতে এসেছেন, তার ভাতিজা তাকে খবর দিয়েছেন, পোকা এ বয়কট দলিল কেটে ফেলেছে। আবু তালেব আরো বলেন, এ কথা মিথ্যা প্রমাণিত হলে আমরা তার ও তোমাদের মাঝ থেকে সরে দাঁড়াবো, তখন তোমরা যা ইচ্ছা তাই করো। আর যদি সে সত্য প্রমাণিত হয় তাহলে তোমাদের এ যুলুম অত্যাচার থেকে বিরত হতে হবে। আবু তালেবের কথায় কোরায়শরা বললো, আপনি ইনসাফপূর্ণ কথাই বলেছেন।

এ নিয়ে আবু জাহল ও অন্যদের তর্ক বিতর্ক শেষ হলে মোতয়েম বিন আদী অংগীকারপত্র ছিঁড়তে গিয়ে দেখেন, আল্লাহর নাম লেখা অংশ বাদে বাকি অংশ সত্যি সত্যি পোকায় খেয়ে ফেলেছে। পরে অংগীকারপত্র ছিঁড়ে ফেলা হলে বয়কটের অবসান হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা) ও অন্য সকলে শেবে আবু তালেব থেকে বেরিয়ে আসেন।’ [১][২][৩]

আবিদ বলছিল আর মাসুম তন্ময় হয়ে শুনছিল।
আবিদ আরও বলল, মানুষকে দ্বীনের পথে ডাকা এবং দ্বীনের কাজ করার জন্য ঠিক এভাবেই উদ্যোগী হতে হবে। প্রথমে একজন, একজন থেকে দুইজন, দুইজন থেকে তিনজন, তিনজন থেকে পাঁচজন…..।
-‘জাজাকাল্লাহ, এই ঘটনা আমি আগেও পড়েছি কিন্তু এভাবে কখনো চিন্তা করি নাই। তোমার সাথে আলোচনায় আমি প্রতিবারই নতুন কিছু না কিছু শিখি,’ মাসুম বলল।
-আবিদ মুচকি হাসল। বলল- ‘ঠিক এই কারণেই আমাদের একে অপরে সাথে আলোচনা করা, সম্মিলিতভাবে কাজ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তোমার থেকেও আমি অনেক কিছু শিখে থাকি।’
-মাসুম হেসে প্রস্তাব দিল, ‘তাহলে চলো, আমাদের তৃতীয় একজন সঙ্গী খুজে বের করি।’
__________________
[১] সীরাহ- রেইন ড্রপস থেকে প্রকাশিত
[২] আর রাহীকুল মাখতুম
[৩] সীরাত ইবনে হিশাম

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*