সাহাবীদের কথা – উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)

মক্কায় ইসলাম প্রচার শুরুর পর মুসলিমদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন অনেক বেড়ে গেলে রাসূল (সাঃ) মুসলিমদের প্রথমে আবিসিনিয়া হিজরতের নির্দেশ দেন। উসমান ইবন মাযউন (রাঃ) আবিসিনিয়া হিজরতকারী সেই দলের সাথে ছিলেন। আবিসিনিয়ায় হিজরতের পর তিনি মক্কায় ফিরে আসতে চাচ্ছিলেন। যেহেতু তিনি মক্কা থেকে হিজরত করেছিলেন, তাই কারো পক্ষ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস ব্যতীত মক্কায় নিরাপদে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। ওয়ালীদ বিন মুগীরা তাঁকে নিরাপত্তা দান করলো। সে ছিল মক্কার বয়স্ক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একজন। ওয়ালিন বিন মুগীরার নিরাপত্তায় উসমান ইবন মাযউন (রাঃ) মক্কায় প্রবেশ করেন।

মক্কায় ফিরে এসে আবিষ্কার করেন যে, তিনি ছাড়া অন্য সব মুসলিমরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে! নিজের নিরাপদ জীবন তাঁকে এতটুকু খুশি করলো না, মজলুম মুসলিমরা তাঁকে ঈর্ষান্বিত করে তুললো! তাঁর কাছে মনে হলো তিনি বাদে অন্য সবার গুনাহ মাফ হয়ে যাচ্ছে আর তিনি কিছুই করতে পারছেন না। তাই তিনি ওয়ালিদের কাছে ফিরে গিয়ে বললেন যে তাঁর নিরাপত্তার কোন দরকার নাই, তিনি সেটা ফিরিয়ে দিতে এসেছেন। ওয়ালিদ বললো,
-তুমি কেন এটা করছো?
-আমি শুধু আল্লাহর নিরাপত্তা চাই, তোমার নিরাপত্তা চাই না।
-ঠিক আছে, যেহেতু আমি প্রকাশ্যে তোমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছি, সেহেতু এই নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণাও প্রাকাশ্যেই দিতে হবে।

তারা কাবা ঘরে গেলেন। আল –ওয়ালিদ বিন মুগীরা বললো, ‘উসমান বিন মাযউন আমার নিরাপত্তা আর চায় না, সে ফিরিয়ে দয়েছে।’
উসমান বিন মাযউন বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি ওয়ালিদ বিন মুগীরাকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও সৎ লোক হিসেবে পেয়েছি, কিন্তু আমি একমাত্র আল্লাহর নিরাপত্তার মধ্যে আসতে চাই।’

কিছুক্ষণ পর দেখা গেল উসমান ইবন মাযউন একটা জনসমাবেশে এসেছেন। সেখানে তখন আরবের বিখ্যাত কবি মুবাইদ তার একটা কবিতা আবৃত্তি করছিল, ‘আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই অসার।’ উসমান তাল মেলালেন, বললেন, ‘ঠিক! ঠিক!’ ওই সমাবেশে অনেক লোক জমা হয়েছিল। কবি বলে চললো, ‘আর সব সুখ তো ম্লান হয়ে যাবে।’ উসমান তার কবিতার মাঝপথে বাধা দিয়ে বললেন, ‘না না, তুমি ভুল বলেছো, জান্নাতের সুখ কখনই ম্লান হবে না।’

কবি মুবাইদ একটা ধাক্কা খেল। সে তার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, তার শ্রোতাদের মধ্যে কেউ এভাবে তার ভুল ধরিয়ে দেবে! কুরাইশদের উদ্দেশ্যে বললো, ‘কে এই লোক? তোমাদেরকে এভাবে হেয় করার সাহস সে কোথা থেকে পেল?’

শ্রোতাদের মধ্যে একজন বললো, ‘বাদ দিন, সে হচ্ছে এক মাথামোটা, মুহাম্মাদের ধর্ম অনুসরণ করে। এর কথায় আপনি কিছু মনে করবেন না।’ উসমান ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন! তিনি এই কথার জবাব দিয়ে বসলেন। ব্যস, শুরু হয়ে গেলো তাদের মধ্যে হাতাহাতি-মারামারি। এক পর্যায়ে কুরাইশরা উসমানের চোখে ঘুষি মেরে বসে।

আল ওয়ালীদ বিন মুগীরা এই ঘটনা দেখলো। উসমানের কাছে এসে বললো, ‘কী দরকার ছিল তোমার চোখের বারোটা বাজানোর? তুমি তো আমার নিরাপত্তার মধ্যেই ছিলে, কেন সেটা ফিরিয়ে দিতে গেলে?’
ঈমানে বলীয়ান উসমান ইবন মাযউন তেজদীপ্ত গলায় বললেন,
-না বিষয়টা তেমন না। আল্লাহর শপথ, আমি তো চাই আমার ভালো চোখটিও যদি আঘাত পাওয়া চোখের মত হতো! সত্যি বলতে কী, আমি এমন একজনের নিরাপত্তায় আছি যিনি তোমার চেয়ে শক্তিশালী এবং ক্ষমতাবান।

একজন কাফের বা মুশরিক কিছু হারালে সেটা ক্ষতির খাতায় ফেলে দেয়। কষ্ট-ব্যথা- বেদনাকে ক্ষতি বাদে অন্য কোনো নজরে দেখে না। কিন্তু একই ঘটনা একজন মুসলিমের জন্য সুসংবাদ। মার খেয়ে, ফোলা চোখ নিয়েও উসমান ইবন মাযউন (রাঃ) ভাবছেন, ব্যথার বিনিময়ে কিছু গুনাহ মাফ হলো। এটাই মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী।

_________________

সূত্রঃ সীরাহ

Comments

comments

2 Comments Posted

    • না, ইনি তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) নয়। ইনি অন্য আরেকজন সাহাবী।
      ঘটনাটি আসহাবে রাসূলের জীবনকথার দ্বিতীয় খন্ডেও পাওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*