একটি মাত্র হাদীস, যেন একটি জীবনদর্শন!!

একটি হাদীস। মাত্র একটি হাদীস, অথচ মনে হচ্ছে এটাতেই পুরো একটি জীবনদর্শন বলে দেওয়া হয়েছে। হযরত আবূ যার গিফারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসটি নিম্নরূপঃ

“আবূ যার গিফারী (রাঃ) বলেনঃ আমি মসজিদে প্রবেশ করি। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) একাকী মসজিদে অবস্থান করছিলেন। আমিও তাঁর পার্শ্বে বসে পড়ি এবং বলি, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আমাকে নামাযের নির্দেশ দিয়েছেন?’ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ হ্যাঁ, নামায উত্তম কাজ। তাই, হয় তুমি নামায বেশী করে পড় না হয় কম করে পড়।’ আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন আমল উত্তম? তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ও তাঁর পথে জিহাদ করা।’ আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন মুমিন উত্তম। তিনি বলেনঃ “সর্বাপেক্ষা উত্তম চরিত্র বিশিষ্ট ব্যক্তি।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বোত্তম মুসলমান কে? তিনি বলেনঃ “যার কথা ও হাত হতে মানুষ নিরাপদে থাকে।” আমি বলি, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন হিজরত উত্তম? তিনি বলেনঃ “মন্দকে পরিত্যাগ কর।”  আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন গোলাম আযাদ করা উত্তম? তিনি বলেনঃ ‘যে গোলামের মূল্য বেশী ও তার মনিবের নিকট বেশী পছন্দনীয়।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ সাদকা সর্বোত্তম? তিনি বলেনঃ “অল্প মালের অধিকারী ব্যক্তির চেষ্টা করা ও গোপনে দরিদ্রকে দান কর।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কুরআন কারীমের মধ্যে সবচেয়ে বড় মর্যাদাসম্পন্ন আয়াত কোনটি? তিনি বলেনঃ “আয়াতুল কুরসী।”

অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! সাতটি আকাশ কুরসীর তুলনায় ঐরূপ যেরূপ কোন মরুপ্রান্তরে একটি বৃত্ত এবং কুরসীর উপর আরশের মর্যাদা ঐরূপ যেরূপ প্রশস্ত প্রান্তরের মর্যাদা বৃত্তের উপর। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নবী কতজন? তিনি বলেনঃ ‘এক লক্ষ্য চব্বিশ হাজার।” আমি বলি, তাদের মধ্যে রাসূল কতজন? তিনি বলেনঃ “তিনশ জন, বড় পবিত্র দল।” আমি জিজ্ঞেস করি সর্বপ্রথম কে? তিনি বলেনঃ “হযরত আদম (আঃ)।” আমি বলি, তিনিও কি রাসূল ছিলেন? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, আল্লাহ তা’আলা তাঁকে স্বহস্তে সৃষ্টি করতঃ ওঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দেন এবং তাঁকে ঠিকঠাক করেন।”

অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘জেনে রেখো যে, চারজন হচ্ছেন সুরইয়ানী। (১) হযরত আদম (আঃ), (২) হযরত শীষ (আঃ), (৩) হযরত খানুখ (আঃ) তিনিই হচ্ছেন হযরত ইদরীস (আঃ), যিনি সর্বপ্রথম কলম দ্বারা লিখেছেন এবং (৪) হযরত নূহ (আঃ)। আর চারজন হচ্ছেন আরবী। (১) হযরত হূদ (আঃ), (২) হযরত শু’আইব (আঃ), (৩) হযরত সালিহ (আঃ) এবং (৪) তোমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। সর্বপ্রথম রাসূল হচ্ছেন হযরত আদম (আঃ) এবং সর্বশেষ রাসূল হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। আমি জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা’আলা কতখানা কিতাব অবতীর্ণ করেছেন? তিনি বলেনঃ ‘একশ চারখানা। হযরত শীষ (আঃ)- এর উপর পঞ্চাশ খানা সহীফা, হযরত খানুখ (আঃ) এর উপর তিনাখানা সহীফা, হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর উপর দশখানা সহীফা, হযরত মূসা (আঃ) এর উপর তাওরাতের পূর্বে দশখানা সাহীফা ও তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জীল, ও ফুরকান নাযিল করেন।” আমি বলি,  হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর সাহীফায় কি ছিল? তিনি বলেনঃ ওর সম্পূর্ণটাই ছিল নিম্নরূপ-

“হে বিজয়ী বাদশাহ! আমি তোমাকে দুনিয়া জমা করার জন্যে পাঠাইনি, বরং এ জন্যে পাঠিয়েছি যে, তুমি অত্যাচারিতের প্রার্থনা আমার সামনে হতে সরিয়ে দেবে। যদি তা আমার নিকট পৌঁছে যায় তবে আমি তা প্রত্যাখ্যান করবো না।” তাতে নিম্নরূপ দৃষ্টান্তও ছিল- জ্ঞানীর এটা অপরিহার্য কর্তব্য যে, সে যেন তার সময় কয়েক ভাগে ভাগ করে। একটি অংশে সে নিজের জীবনে হিসেব গ্রহণ করবে। এক অংশে আল্লাহ তা’আলার গুণাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করবে, একাংশে সে পানাহারের চিন্তা করবে। জ্ঞানীর নিজের তিনটি জিনিস ছাড়া অন্য কোন জিনিসে লিপ্ত রাখা উচিত নয়। প্রথম হচ্ছে পরকালের পাথেয়, দ্বিতীয় হচ্ছে জীবিকা লাভ এবং তৃতীয় হচ্ছে বৈধ জিনিসে আনন্দ ও মজা উপভোগ। জ্ঞানীর উচিত যে, সে যেন নিজের সময়কে দেখতে থাকে, স্বীয় কার্যে লেগে থাকে এবং স্বীয় জিহ্বাকে সংযত রাখে। যে ব্যক্তি স্বীয় কথাকে তার কাজের সঙ্গে মিলাতে থাকে সে খুব কম কথা বলবে। তোমরা শুধু ঐ কথাই বল, যাতে তোমাদের উপকার হয়।”

আমি জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত মূসা (আঃ) এর সহীফাসমূহে কি ছিল? তিনি বলেনঃ “ওটা শুধু উপদেশে পরিপূর্ণ। যেমন আমি ঐ ব্যক্তিকে দেখে বিস্মিত হই যে মৃত্যুকে বিশ্বাস করে অথচ আনন্দে আত্নহারা হয়ে থাকে। ভাগ্যের উপর বিশ্বাস রাখে অথচ হায় হায় করে। দুনিয়ার অস্থায়িত্ব অবলোকন করে অথচ নিশ্চিন্ত থাকে। কিয়ামতের দিন যে হিসাব দিতে হবে এটা জানে অথচ আমল করে না।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তী নবীদের গ্রন্থসমূহে যা কিছু ছিল ওগুলোর মধ্যে আমাদের গ্রন্থেও কিছু রয়েছে কি? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, হে আবূ যার! দেখ আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّى

وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا

وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى

إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَى

صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى

অর্থাৎ ‘মুক্তি পেয়েছে ঐ ব্যক্তি যে পবিত্র হয়েছে। আর তার প্রভুর নাম স্মরণ করতঃ নামায পড়েছে। বরং তোমরা ইহলৌকিক জীবনের উপর গুরুত্ব দিচ্ছ, অথচ পরলৌকিক জীবন উত্তম ও চিরস্থায়ী। নিশ্চয়ই এটা পূর্ববর্তী সাহীফাগুলোতে রয়েছে। রয়েছে ইবরাহীম ও মূসার সাহীফায়।’ (৮৭: ১৪-১৯)

আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বলেনঃ আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি আল্লাহকে ভয় করতে থাক। এটাই হচ্ছে তোমার কার্যের প্রধান অংশ।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলন। তিনি বলেনঃ ‘কুরআন পাঠ ও আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাক। এটা তোমার জন্যে আকাশসমূহে যিকিরের এবং পৃথিবীতে আলোকের কারণ হবে।’ আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও বলুন। তিনি বলেনঃ “সাবধান! অতিরিক্ত হাসি হতে বিরত হও। এর ফলে অন্তর মরে যায় এবং চেহারার ঔজ্জ্বল্য দূর হয়ে যায়।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ “জিহাদে লিপ্ত থাক, আমার উম্মতের জন্যে এটাই হচ্ছে সংসার ত্যাগ।” আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আরও কিছু উপদেশ দিন। তিনি বলেনঃ ‘উত্তম কথা বলা ছাড়া মুখ বন্ধ রেখো। এতে শয়তান পলায়ন করে এবং ধর্মীয় কাজে বিশেষ সহায়তা লাভ হয়।”

আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘তোমা অপেক্ষা নিম্ন পর্যায়ের লোকদের দিকে দেখ, তোমা অপেক্ষা উচ্ছ পর্যায়ের লোকদের দিকে দেখো না। এতে তোমার অন্তরে আল্লাহ তা’আলার নিয়ামতরাজীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাবে।’ আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও বলুন! তিনি বলেনঃ “দরিদ্রদের প্রতি ভালবাসা রেখো এবং তাদের সাথে উঠাবসা কর। এতে আল্লাহ তা’আলার করুণা তোমার কাছে খুব বড় বলে মনে হবে।’ আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ ‘আত্নীয়দের সাথে মিলিত থাক যদিও তারা মিলিত না হয়।’ আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আরও কিছু বলুন। তিনি বলেনঃ “ সত্য কথা বলতে থাক যদিও তা কারও কাছে তিক্ত বলে মনে হয়।” আমি তাঁর নিকট আরও উপদেশ যাঞ্চা করি। তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা’আলার ব্যাপারে ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনাকে ভয় করো না।” আমি বলি, আরও বলুন। তিনি বলেনঃ “নিজের দোষ-ত্রটির প্রতি লক্ষ্য কর। অন্যের দোষ-ত্রুটির প্রতি লক্ষ্য রাখা হতে বিরত থাক।”

অতঃপর তিনি আমার বক্ষে হাত রেখে বলেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! তদবীরের মত কোন বুদ্ধিমত্তা নেই, হারাম হতে বিরত থাকার মত কোন তাকওয়া নেই এবং উত্তম চরিত্রের মত কোন বংশ নেই।”

হাদীসটি ‘তাফসীর ইবনে কাসীর’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*